সন্ত হারিয়ে গেছে

সন্ত হারিয়ে গেছে

মোহাম্মদ হরমুজ আলী

মাস্কপরা সন্ত এখন বেগুরে ঘুরে বেড়ায়। তার স্বপ্নও সাধারণ দশজনের মতো ছিলো। পৃথ্বী তাকে হাত ঈশারায় ডাকতো, করতো উতলা চোখ ইশারায়। বুক ধড়ফড়করা সময়গুলো ছিলো তার একান্তই নিজের। তারপরই ঘটে গেলো এই ওলট-পালট। কেউ জানেনা এর বৃত্তান্ত, যা জানে তা আরো বিভ্রান্তিকর। ইনবক্স খুলেছো ত মরেছো,
ওষুধের ফর্দ দেখে নির্ঘাত ভিরমি খেতে হয়। উদ্দ্যেশ্য কুটিল না হলেও একধরনের জোর করে গিলানোর প্রবনতা দৃশ্যমান। সবাইকে যেনো ডাক্তার হবার নেশায় পেয়েছে।

মা-মরা পৃথ্বী দাদীর কাছে মানুষ। দুরন্ত বললে কমই বলা হয়। ছোটবেলায় মাতৃহারা সন্তান নাকি বেশির ভাগ এমনই হয়। যদিও তার দাদীর ঘোর আপত্তি এই উপসংহারে। দাদীর মতে তার পৃথ্বী একটু আধটু দুষ্টুমি করে ঠিকই তবে তা বয়সের কারনে। এর থেকে বেশী কিছু নয়। যার জন্যে নালিশকারীদের শাপান্ত করতেও তিনি ছাড়েন না। সন্তদের পুকুরপাড়ের ময়নার মাকেতো একদিন বলেই ফেললেন - তোর বেলেল্লাপনা কি আমি দেখিনি? এসেছিস আমার একরত্তি ফেরেস্তার নামে নালিশ করতে? আর যদি এমুখো হবি তবে বটি দিয়ে জিব আলগা করে ফেলবো।

সন্তদের বাড়ির আগুনকোনা বরাবর একবাড়ি পরেই পৃথ্বীদের দুচালা বাড়ি। শ্রেণীবিন্যাসে পৃথ্বীরা নিম্নমধ্যবিত্ত। সন্তরা মধ্যবিত্ত। পৃথ্বী যেদিন থেকে এই বিন্যাস বুঝতে শিখেছে সেদিন থেকেই সন্তকে একধরনের সমীহ করে যা সন্তের পুরোপুরি বুঝে উঠতে খানিকটা সময় লাগে। তার পৃথ্বী তার দুনিয়া। এর থেকে বেশি কিছু সে জানতেও চায় না, মানতেও চায় না। 

কলেজ ছুটির অপেক্ষায় থাকা সন্তের না কাটে দিন না রাত। আহা! হিন্দুদের বারো মাসে নাকি তেরো পার্বণ, মুসলমানদেরও যদি এমন হতো কিংবা তার থেকে বেশি। তাকে যে বাড়ি যেতে হবে, তার পৃথ্বী পথ চেয়ে আছে। বরাবরের মতো গোমড়া মুখে অনুযোগ করবে - এতো দিনে সাহেবের আসা হলো? যা সন্ত খুবই উপভোগ করে। ঠিক এমন সময়ই এলো এই ওলট-পালট। শুধু কলেজই নয়, সরকারের অফিস আদালত থেকে দোকানপাট সবই বন্ধ; মন্দির মসজিদও বাদ পড়েনি। তাও আবার পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত। প্রথমে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করলেও ভেসে উঠা পৃথ্বীর মুখ আর অন্তহীন সময় কাছে থাকার লোভ তার সর্বাঙ্গে ঝিলিক ছড়িয়ে দেয়।

দুনিয়া ব্যাপী ওলট-পালটের ঢেউ গ্রামীণ জীবনেও লেগেছে তবে তা শহরের মতো নয়। বিষয়টি এখনও দেখা যাক কি-হয় পর্যায়ে রয়ে গেছে। 'লকডাউন' এই অচেনা শব্দের সরকারি ঘোষণার ব্যাপারে আমজনতার মধ্যে কেমন যেনো একটা দোদিলামি কাজ করছে। বেশির ভাগের কাছে যা ভয়ংকর, অভিশাপ; পৃথ্বীর কাছে তা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!

সন্তের বাঁধ না মানা বিহঙ্গ-মন পৃথ্বী-চিন্তায় বিভোর। পাগলপারা হৃদয়ে বাড়ি আসলো ঠিকই কিন্তু কোথায় যেনো একটা ছেদ অনুভূত হচ্ছে। যার সাথেই দেখা হয় ঐ একই বৃত্তান্ত। শহর ফেরত হওয়ায় পাবলিকের আগ্রহও সীমাহীন, যে আগ্রহের কাছে সে অনেকটাই লাচার। চীন না আমেরিকা - কে এই অভিশাপ ডেকে এনেছে? এটা আসলেই আল্লাহর গজব না মানুষ মারার ফন্দি? তা-ই যদি হবে তবে বিলাত-আমেরিকায় এমন লাশের মিছিল কেনো? তাছাড়া হুজুররাতো ইতোমধ্যে ঘোষণাই দিয়ে রেখেছেন যে ঈমানদার মুসলমানের এই রোগ হতেই পারেনা! এমন হাজারো জিজ্ঞাসায় সন্ত চিন্তার খেই হারিয়ে ফেলে। কেমন করে বুঝায় যে তার মাথায় শুধুই পৃথ্বী। যেখানে দুনিয়াসুদ্ধ বিজ্ঞানী আর বিশেষজ্ঞরাই কুপোকাত সেখানে সন্ত কোন ছার! এই করে করে মাথার উপরের সূর্য একসময় পশ্চিমে ডুব দিলো। না হলো নিরালায় দেবী দর্শন, না অনুযোগের দমকা হাওয়ায় ভর করে একপশলা বৃষ্টি।

এমনি করেই দিন যায়। পৃথ্বীও দু'একবার সন্তদের পুকুর পাড় চক্কর দিয়ে গেছে, এমনকি পা ধোয়ার ছলে ঘাটেও নেমেছে কিন্তু চোখাচোখি ছাড়া কোনো কথা হয়নি। সবকিছুই কেমন যেনো থমকে গেছে। যেদিকেই তাকায় শুধুই জটলা, যেমন পুরুষের তেমনই মহিলাদের। সবার মাঝেই এক অজানা আতংক। পৃথ্বী যে উত্তেজনায় এদ্দিন সন্তের পথ চেয়ে থেকেছে আজ তা-ই সূঁচের মতো বিঁধছে হৃদয়ে, পিত্তে।

ভাদ্রের তালপাকা-রোদ মাথায় সন্ত একদিন পৃথ্বীদের বাড়িমুখো হাটছিলো। প্রবেশমুখের কাছাকাছি যেতেই চোখ আটকে গেলো পৃথ্বীর চোখে। যে চোখে জমা হয়ে আছে সন্তের জন্য পৃথ্বীর অনিঃশেষ গল্প, যা না যাচ্ছে শুনানো, না হচ্ছে শুনা। তুমি কেমন আছো পৃথ্বী - সন্ত জিজ্ঞেস করে। কাঁপা ঠোঁটে কিছু বলার আগেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠে পৃথ্বীর। গত চার পাঁচদিন থেকে দাদীর ভীষণ জ্বর সাথে কাশি আর প্রচন্ড গা ব্যাথা। প্রথমে তেমন কিছু মনে না হলেও আস্তে আস্তে ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা উপসর্গগুলো কেমন যেনো মিলে যাচ্ছে একে একে। লোকমুখে শুনা; কোনো এক গ্রামে করোনা সন্দেহে এক পারিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছে, আরো কতো কী। দাদীর কোলেপিঠে মানুষ পৃথ্বী এক অজানা ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে, গলা দিয়ে খাবার নামছে না এই ক'দিন; মাথাতো ঘুরবেই। ঈশারায় কাছে ডেকে কোনোমতে বললো - আমার দাদী! তারপরই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেলো। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুঢ় সন্ত পাজাকোলা করে পৃথ্বীকে ঘরে নিলো ঠিকই কিন্তু বিবশতা কাটছেনা। অসহায়ের মতো বিড়বিড় করে শুধু বললো - বড্ড দেরী করে ফেললে পৃথ্বী।

সন্ত এখন সকালবিকাল পৃথ্বীদের বাড়ি যায়। দুর্মুখেরা আড়ালে আবডালে নানান কথা বললেও মুখের উপর কিছু বলার সাহস করেনা পারিবারিক মর্যাদার কারনে। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানোর শ্বাশত মূল্যবোধটুকুও দারুন করোনার ছোবলে উবে গেছে। দাদীর শ্বাসকষ্ট এখন সাক্ষাৎ আজরাইল। শুধু জান কবজের অপেক্ষা, এবং হলোও তাই। আমাকে একা ফেলে তুমিও চলে গেলে দাদু - পৃথ্বীর গগনবিদারী চিৎকার অনেকদূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হলেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া খুব বেশী কেউ এ'মুখো হলো না। মসজিদের গরীব মুয়াজ্জিনের ইমামতিতে পাড়ার গুটিকয় মানুষ মিলে দাদীর লাশ দাফন করা হলো। যদিও কোনোদিনই জানা হবে না কৈশোরে পা দেয়া সেদিনের সেই মানুষটি যে বউ হয়ে এ'পাড়ায় এসেছিলো এবং আশিটি বছর একই আলোবাতাসে সুখেদুখে কাটিয়ে গেলো তার মৃত্যুর কারণ।

দাদীর লাশ দাফনের পর থেকে পৃথ্বী আর কোনো কথা বলেনা, হাহাকার চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে। জোর করে পানি খাওয়ানো গেলেও ভাত তার গলা দিয়ে নামানো যায় না। সন্তও আর আগের মানুষ নেই। পুকুরপাড়ে ইজিচেয়ারে বসে থাকে আর চুল টানে সূর্য ডোবা পর্যন্ত। তারপর বাতি নিভিয়ে ঘুম কিংবা ঘুমের কসরত। একদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে জ্বর গায়ে কেঁপে কেঁপে সন্তের সামনে এসে দাঁড়ায় পৃথ্বী। আচমকা শাড়ির আচলে বাঁধা গিট্টু থেকে একটা মাস্ক বের করে সন্তকে পরিয়ে দিয়ে ধীর পায়ে চোখের আড়াল হয়ে যায়। সন্ত ডাকার চেষ্টা করে, গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না।

লন্ডন, ১৭ জুলাই ২০২০