শাহেদদের আগমন

শাহেদদের আগমন

তাহমীম সৈয়দ হক
পত্র পত্রিকায়, ফেসবুক জুড়ে এখন শাহেদ কাহিনী ঘুরছে। তাঁকে সবাই ধুয়ো দিচ্ছেন। গালি দিচ্ছেন। আসলে এই শাহেদরাই এখন সব। তাঁরাই দল চালাচ্ছে। দলে তাদের সংখ্যা বেশী। পয়সা, তদ্বির, মেকানিজম সব তাদের দখলে। তৃণমূল ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাদের ভারে ন্যুজ। ত্যাগীরা সিলেটের মঞ্জু মিয়ার মতো না খেয়ে, ঘরের টিনে তাদের পানি পড়ে, বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে এটাই বাস্তব। তাদের কান্না ওপর থেকে ক্ষমতার সানগ্লাসের চশমায় কেউ দেখছে না এটাই সত্যি। দিনশেষে এই শাহেদ রা চাট্রাড ফ্লাইট নিয়ে ভাগবে এটা নিকট ইতিহাস সাক্ষী। আর ওই যে মঞ্জু মিয়ারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে যেভাবে মাইক নিয়ে একা বের হয়েছিলো আবারো এঁরাই বের হবে এটা ও সত্যি। আমি গত এক যুগ এক দশক থেকে বাংলাদেশের গ্রাস রুট সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের বিবর্তন দেখি। দলের এই পরিবর্তন দেখে আঁতকে উঠি। স্মৃতি হাতরাই। সাদা কালো যুগ বাদ দেই, রঙিন যুগের সূচনা লগ্নে দলের এই নৈতিক পতন কল্পনাও করিনি। আওয়ামী লীগ এর মতো দলের গত পঞ্চাশ বছরের দলের কাঠামো গুলো দেখুন। কমিটি গুলো দেখুন। দলের নিউক্লিয়াস আব্দুর রাজ্জাকের ভাষায় দল ভাঙ্গবে তবুও মচকাবে না। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যা কাণ্ডের পর এই পোড় খাওয়া নেতা কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রাখে। ব্যবসায়িক কেউ দলে ঢুকতে চাইলেও দল তাদের ব্যাপারে উন্নাসিক ছিল এটা সত্যি। পাজেরো, মিতটুবেসি, টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার এগুলো তখনো দলে জায়গা করে নিতে পারে নি। এরশাদের পতনের পর ৯১ এর নির্বাচনের সময় আওয়ামীলীগ দলের মাঠ পর্যায়ের যোগ্য নেতা কর্মী দের মনোনয়ন দিয়েছিলো। এর বিপরীতে আমরা দেখলাম বিএনপি সব ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দকে মনোনয়ন দিলো। কালো টাকা, পেশী শক্তি এস্টাব্লিস্মেন্ট এগুলো সামনে চলে আসলো। ইলেকশন মেশিনারিজ প্রশাসন এগুলো টাকার গুরুত্ব বুঝলো। এগুলোই সূক্ষ্ম কারচুপি। আওয়ামীলীগের মাঠ পর্যায়ের জেলা নেতা গুলো এভাবে হেরে গেলো। জনপ্রিয়তা এক জিনিষ আর ইলেকশন জেতা ভিন্ন জিনিষ তা আওয়ামীলীগ বুঝলো। দলের এই রিয়েলাইজেসন দলকে আস্তে আস্তে বদলাতে থাকলো। ব্যবসায়ী আমলা আর্মি পার্সন জনতার মঞ্চ এগুলো আস্তে আস্তে দলে ঢুকলো। শাহেদরা তখন ব্যালেন্স করে চলতো। ক্ষমতায় গেলে শাহেদরা আস্তে আস্তে দলে ভিড়তে চাইলো। ভিরলো। সুবিধা নিলো। সেই থেকে শুরু। তবে দলে এখনকার মতো তাদের প্রভাব বা অবস্থান স্থিতু হতে পারে নি  আপনি চিন্তা করুন আওয়ামীলীগ এর মতো দলে সমালোচনা ছিলো। দলের প্রেসিডিয়াম কার্যকর ছিলো। র‍্যাটস বলে পরিচিত ওরা চারজন আব্দুর রাজ্জাক, আমীর হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ এবং সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত প্রেসিডিয়ামে কথা বলতেন, বিভিন্ন পলিসির সমালোচনা করতেন। সভানেত্রীর সিদ্ধান্তও মাঝে মাঝে দ্বিমত দিতেন। ওয়ান ইলেভেন আমাদের বদলে দিলো। আর এর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরো মানসিকতাই বদলে দেয়। ইতিহাস সাক্ষী। হাওয়া ভবনের হাত ধরে শাহেদরা এভাবে আসতে থাকে রাজনীতিতে। গত ১২ বছর একটানা আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকায় দলের সাংগঠনিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে ভাইরাস ঢুকে গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনে এক দল এর নিরঙ্কুশ কর্তিত্ব থাকায় বিরোধী দল সংকুচিত হয়ে পড়ায় ক্ষমতার রাজনীতির ভারসাম্য আর থাকে না। শাহেদ রা ক্রমশ আওয়ামী লীগে জায়গা করে নেয়। সচিবালয় থেকে মন্ত্রীর বাড়ী, পুলিশ অফিসার, রেব এরা পৌঁছে যায়। মন্ত্রীর বউ, পুলিশের বউ সব তাদের ভাবী। এরই মধ্যে উপসর্গ আরেকটা যুক্ত হয়েছে নাম উপ কমিটি। এই উপ কমিটির নাম ভাঙ্গিয়ে তাঁরা কার্ড বানায়, টক শো তে যায়, পৌঁছে যায় মন্ত্রীর বেড রুম পর্যন্ত। টক শো তে যেতেও এরা টাকা পয়সা খরচ করে। ভাব দেখায় এরা শেখ পরিবারের আত্মীয়, বন্ধু। পঁচাত্তর পরবর্তী একটি ভঙ্গুর অবকাঠামোর দল নিয়েও শুধু মাত্র বঙ্গবন্ধু পরিষদ নীরবে নিয়ে বুদ্ধিজীবী দের নিয়েও আওয়ামীলীগ মানুষের কাছে পোঁছেছে। আর এখন এরা চার পাঁচটা বই নিয়ে টকশোতে গিয়ে চশমা লাগিয়ে এমন ভাব করে যে অক্সফোর্ড কেমব্রিজ তাঁর কাছে নমস্য। সাবেক ছাত্রনেতা নাম ভাঙ্গিয়ে এই সব টক শো স্টার দের খবর খুঁজলে দেখা যাবে যে এরা কোন ব্যাংক খেয়ে এসেছেন। এখন দলে ওএসডি। তবে তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে উপ কমিটি।
আর শাহেদ দের মতো পাপিয়ারাও দলে সয়লাব হয়ে গেছে। ওই যে হিন্দি রাজনীতি মুভি তে যে মেয়ে ইলেকশনে দলের মনোনয়ন চাচ্ছে। এই পাপিয়ারা তাহারা। এরা দেশে, লন্ডনে, নিউ ইয়র্কে। নিরাপত্তার দায়িত্বে যারা তাঁরা তাঁদেরকে আটকাতে হিমশিম খান। শাহেদ রা তাদের জায়গা মতো পাঠান। এই খবর গুলো শুধু ভাইরাল হয় না। কিন্তু যারা জানার তাঁরা ঠিকই জানেন। সাজেদা চৌধুরী, আইভি রহমান, সাহারা খাতুন রা রাজপথে জীবন দিয়ে মহিলা লীগ করেছে। এখন আমরা শুনছি যুব মহিলা লীগ। তাও যুবলীগ থাকতে। ওই যে বললাম সংরক্ষিত মহিলা আসন এসব যুবতিদের দের টার্গেট। গত এক দশকে দলের এই পরিবর্তন চোখের সামনে দিয়ে ঘটেছে। কমিটি গঠনে বেচাকেনা এই গুলো এখন ওপেন সিক্রেট। স্থানীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন কমিটিতে ঢুকার গুরুত্ব বাড়িয়েছে শতগুণ। খালি পয়সা আর পয়সা। এভাবেই শাহেদ রা উঠে এসেছে। লেখাটি শেষ করতে চাচ্ছি। শাহেদ দের যে ছবি গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে তা নিছক সেলফি নয়। একেকটা ছবি একেকটা বার্তা। তাঁর ক্ষমতা সম্পর্কে ধারনা দেওয়া। আমার এক প্রিয় বড় ভাই আছেন তাঁর নাম ইমতিয়াজ মাহমুদ।তার লিখা এখন বাংলাদেশে হাজার হাজার মানুষ পড়ে। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা সহ শেখ হাসিনার ১/১১ এর মামলাগুলো পরিচালনায় একজন ছিলেন। তবে তিনি আওয়ামীলীগ করেন না। মুজিব কোট নিয়ে একটি লেখা লিখেছেন। আবেগ ঘন সেই লেখা। মুজিব কোট পড়ে এখন ইম্যুনিটি নেয় শাহেদরা। আহা দুঃখ। এই ছেঁড়া মুজিব কোট পড়ে মিছিলে আসতো মঞ্জু মিয়ারা। ক্ষমতায় আসার একুশ বছর আগে আমাদের শুনতে হয়েছে - কম্বল কাটা মুজিব কোট আর দেব না নৌকায় ভোট। তাঁরাই এখন শাহেদ হয়ে আওয়ামী লীগ করে। মঞ্জু মিয়াদের এই ছেঁড়া মুজিবকোট আজ শাহেদদের দখলে। কবি তারাপদ রায়ের মতো বলতে হয় -
আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম যার উদ্দেশ্যে ধ্রূপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ প্রশস্তি লিখেছিলাম। আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্‌ পেন হয়ে গেছে আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন। আমরা বুঝতে পারিনি আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।

লেখকঃ নব্বই দশকের ছাত্রনেতা । আইনজীবী । ব্লগার ।