অর্থবিষম সমাজে শুধু আইন করেই অনাচার দূর হবেনা

অর্থবিষম সমাজে শুধু আইন করেই অনাচার দূর হবেনা

রুহুল কুদ্দুস বাবুল 


একথা অস্বীকার উপায় নেই যে আমরা দিন দিন ধনি হচ্ছি। আমাদের অর্থনীতিও এগোচ্ছে। মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে, প্রবৃদ্ধির সংখ্যাগত দিক থেকেও অগ্রগতি হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীতে এ অগ্রগতি অনেকটা হোচট খাবে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ প্রবৃদ্ধির যে গুণগত দিক, যেমন প্রবৃদ্ধির সুফল সবার মাঝে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে কিনা, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর কারণ দেখা যাচ্ছে দিন দিন উচ্চবিত্তদের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬  বিবিএসের খানা জরিপ অনুযায়ী,  উপরের ৫ শতাংশ লোকের হাতে মোট দেশজ আয়ের ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ রয়েছে, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে নিচের ৫ শতাংশ লোকের আয় ২০১০ সালের শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ থেকে কমে ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ হয়েছে। বিবিএসের হিসাবে দেশে আয়বৈষম্য ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
বৈষম্য বৃদ্ধির বড় কারণ ভোগ প্রবণতার মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ। সবচেয়ে গরিব ২০ লাখ পরিবারের মাসিক গড় আয় ৭৪৬ টাকা।
সবচেয়ে ধনী ২০ লাখ পরিবারের মাসিক গড় আয় ৮৯ হাজার টাকা। 
আয়বৈষম্য থেকে পুরো সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যে বিভাজন সৃষ্টি হয়, তা অর্থনীতির জন্য সামাজিক স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠে। বৈষম্য থেকে জন্ম নেয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। বেড়ে যায় সামাজিক অনাচার। যতক্ষণ পর্যন্ত সবার জীবনযাত্রার মান উন্নত করা যাবে এবং সব ধরনের বৈষম্য লাঘব করা না যাবে , ততক্ষণ উচ্চপ্রবৃদ্ধি আর এগিয়ে চলেছি বলে তৃপ্তির ঢেকুড় তোলে কোন লাভ নেই। উচ্চ প্রবৃদ্ধিও তাৎপর্যপূর্ণ হবে না। 
আয়বৈষম্য থেকে সৃষ্টি হয় ভোগের বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য, সুযোগের বৈষম্য। এ থেকে তৈরি হয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য। বিদ্যমান দুর্নীতিনির্ভর রাজনীতিতে সম্পদ ক্ষমতার সহায়ক অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে। সেজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিত্তশালীদের প্রভাব বেড়েই চলেছে । তারা বৈধ কিংবা অবৈধ যেকোন পন্থায় অর্জিত সম্পদের সুরক্ষা চায়।  এজন্য ক্ষমতার প্রয়োজন। প্রকৃত গণতান্ত্রিক জবাবদিহিমূক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত হয়। অগণতান্ত্রিক মানসিকতায় মানুষ নিজেকে নিজের সম্পদকেও নিরাপদ মনে করেনা। তাই ধনিরা যেন তেন প্রকারে ক্ষমতার বলয়ে থাকতে চায়।
আমাদের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল, বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সামাজ প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হতে চলেছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নপূরণে কতদূর যেতে পেরেছি ? ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ী জাতির স্বপ্ন, আকাঙ্খা এমনটাই ছিল আলফ্রেড টেনিসনের অনবদ্য বর্ণনায় বলা যায়-
"আমি ভবিষ্যতের গভীরে তাকালাম,
মানব চক্ষু যতদূর দেখতে পায়, 
সারা বিশ্ব উদ্ভাসিত হল
সে অপরূপ সম্ভাবনা, আমাদের সামনে।"
শোষন, দারিদ্র, অজ্ঞতা, রোগ ও অসাম্যের অবসান করা কি সম্ভব হয়েছে ? হয়নি তো। কেন হয়নি ? উত্তর খুঁজলে সহজেই বলা যায় কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ যারা জীবনপণ যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছে তাদের ক্ষমতায়ন হয়নি। অর্থাৎ জনগণের ক্ষমতায়ন হয়নি। কাঙ্খিত শোষিতের গণতন্ত্র সোনার হরিণ হয়েই থাকল। জনগণ সুশাসন থেকে বঞ্চিতই থাকল।  ক্ষমতা নানান কায়দা কানুনে একটা লুটেরা মানসিকতার নব্য ধনিক গোষ্ঠির হাতে চলে গেল। দুর্নীতিনির্ভর রাষ্টীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করল। সমাজটা সেভাবেই গড়ে উঠল। সবাই যেন তেন প্রকারে ধনি হতে চায়। চলছে ধনি হওয়ার অর্থাৎ টাকা কামানোর এক অশোভন কুৎসিত প্রতিযোগিতা। নেতাদের আশির্বাদে বস্তিবাসি ছেলেও সেই প্রতিযোগিতায় আছে। মুক্তবাজার, মুক্ত মজুদদারী, মুক্ত লুটপাট, মুক্ত ঘুষ-দুর্নীতি। নিয়ন্ত্রণহীন পাগলা ঘোড়ার তাণ্ডবে সমাজ ক্ষতবিক্ষত। বিশিষ্ট সমাজচিন্তক অনিল মুখার্জী তাঁর বিখ্যাত 'অর্থনীতি ও সমাজ বিকাশ' গ্রন্থে এভাবে বর্ণনা করেছেন-
"সমাজের প্রতিপত্তি অর্থনৈতিক ক্ষমতা তথা উৎপাদনের উপায়গুলি যে শ্রেণীর হাতে, সেই শ্রেণী তাহার অনুকুলে সমাজকে পছন্দমত গড়িয়া তোলে। সমাজটা হইলো কর্তৃত্বশীল শ্রেণীর প্রতিবিম্ব বা ছায়া। নিজের সুবিধামত সমাজ গড়িবার জন্যই প্রধান শ্রেণীকে রাস্ট্র দখল করিতে হয় এবং প্রধানতঃ এই রাস্ট্রযন্ত্রের সাহায্যেই সে নতুন সমাজ গড়িয়া তোলে। রাস্ট্র দখল করিবার পর আসে আইন-কানুন, শিক্ষা-দীক্ষা, রীতি-নীতি, সাহিত্য-কলা-সংস্কৃতি, দর্শন-বিজ্ঞান-ধর্ম, এবং অন্যান্য সবকিছু। মোটকথা, রাস্ট্রই এইগুলি গড়িয়া তোলে কর্তৃত্বশীল শ্রেণীর স্বার্থ মত--এইগুলির সবকিছু, এমন কি কোথাও কিছু সম্বন্ধে ভালমন্দ জ্ঞান পর্যন্ত নির্ধারিত হয় অর্থনীতি দ্বারা..।"
লুটেরা গোষ্টি তাদের শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বও চায়, রাজনীতিবিদের মুকুট পড়ে গড়ে তোলেছে কর্তৃত্ববাদী শাসন। অত্যন্ত নিপুন কৌশলে রাজনৈতিক দলেরও নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। গড়ে তোলেছে নিজস্ব প্রাইভেট বাহিনি। ভোগবাদী ভাবধারা প্রতিষ্ঠালাভ করেছে। আজ জাতি চলমান লুটেরা ধারার রাজনীতির ভয়ংকর রূপ প্রত্যক্ষ করছে। 
বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সংবিধানের চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা ও রাজনীতির গুনগত পরিবর্তন দরকার। দু একটি আইনের সংস্কার কোন সুফল বয়ে আনবেনা । 
এ প্রসঙ্গে বুদ্ধের সমসাময়িক এক রাজার উপাখ্যান বর্ণনা করছি, পড়েছিলাম আদর্শের রাজনীতির দীক্ষাকালে।
"রাজা ধর্মপথে চলিবার ব্যবস্থা করিলেন, কিন্তু দরীদ্রের জন্য ধনের সংস্থান করিলেন না। ইহাতে রাজ্যে দরিদ্রতা আরও বাড়িয়া গেল। লোক পরের ধন অপহরন করিতে লাগিল। তস্করকে লোকে রাজার নিকট লইয়া গেল। রাজা তখন ঐ পুরুষকে জিজ্ঞাসা করিলেন 'তুমি পরের ধন অপহরন করিয়াছ হে পুরুষ, এই অপবাদ কি সত্য ?  চোর কহিল 'হ্যা দেব সত্য'। রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন 'কি কারণে ?' চোর কহিল 'জীবিকা চলিতেছিলনা দেব'। 
রাজা সেই পুরুষকে ধন দেওয়াইলেন। তাহার পর বলিলেন 'হে পুরুষ, এই ধনে তুমি জীবিকা নির্বাহ কর'। রাজ্যের লোক শুনিল রাজা চোরকে ধন দেওয়াইয়াছেন। তখন সকলে ভাবিল আমরাও চুরি করিব। কিন্তু রাজা আর কত ধন দিবেন ?  তিনি মনস্থ করিলেন, এইভাবে তস্করকে ধন দিলে রাজ্যে চুরি বাড়িয়া যাইবে। এখন হইতে চোরের কঠিন শাস্তির বিধান করিতে হইবে।
তাহার মুণ্ডচ্ছেদ করিয়া লইলে রাজ্যে চুরি একেবারে বন্ধ হইতে পারে। 
রাজার আজ্ঞায় চোরের মুণ্ডচ্ছেদ করা হইল।তখন চোরেরা ভাবিল, যে চুরি করে রাজা তাহার শির কাটিয়া লয়। চল এখন আমরাও অস্ত্র শানাই - যাহার চুরি করিব তাহার শিরও কাটিয়া লইব। এইভাবে লোকে ধীরে ধীরে অস্ত্র শানাইল ; পরে শাণিত অস্ত্র লইয়া গ্রাম লুট করিল। পথচারী পথিকের মাথা কাটিয়া লইয়া যথাসম্পত্তি আহরণ করিল।" কাহিনিটি রাহুল সংকৃত্যায়নের বিখ্যাত 'মানব সমাজ' গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত। লেখক রাহুল সংকৃত্যায়ন কাহিনিটির উপর মন্তব্য করেছেন- "বুদ্ধ এই উপখ্যানে নির্ধনতা দূর করিবার কোন উপায় নির্দেশ করেন নাই। তিনি এখানে শুধু বলিয়াছেন, দণ্ডবিধান করিয়া অর্থবিষম সমাজের অপরাধ দূর করা যায় না।"
বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের সার্টিফিকেট পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত। অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতার এ সিঁড়িতে কিছু সংখ্যক মানুষ দৃপ্ত পায়ে আকাশ ছুঁতে চলেছে, আর অধিকাংশ প্রথম ধাপ ছোঁয়া তো দূরে থাক, কাদামাটিতে গড়াগড়ি করছে। অধিকাংশকে বঞ্চিত করে একটা শ্রেণীকে ভাল অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সচেতনভাবেই। যাদেরকে উপরে তোলে দেয়া হলো বা হচ্ছে এদের অধিকাংশই লুটেরা। ক্ষমতার জোরেই চলছে লুটপাট আর অনাচার। যারা বিত্তে বৈভবে ক্ষমতাবান তারা ক্ষমতায় থাকতে চায় ও যেতে চায়- যেন তেন প্রকারে। চলছে ধনার্জনের এক কদর্য নোঙরা প্রতিযোগিতা। 
গণতন্ত্র যেভাবে কেতাবে লেখা থাকে, সেভাবে চর্চিত হয়না। জনগনের চোখ, মুখ বন্ধ করতে নাজিল হয় নতুন কালাকানুন। 
শোষণ, বঞ্চণায় জর্জরিত অধিকাংশ মানুষের কথা বলার লোক নেই। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার পন্থা নিয়েই বাগারম্বর চলছে । আবিষ্কার হচ্ছে আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার নতুন নতুন কৌশল। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণ আর প্রাসঙ্গিক নয়। 
জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য দেশপ্রেমিক জনতার ঐক্য প্রয়োজন। একমাত্র জনতার শক্তিই আদায় করতে পারে অর্থবহ গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্খিত বাংলাদেশ। যারা বিশেষ গোষ্ঠির উন্নয়ন নয়, সমস্ত জনগোষ্ঠির সুষম উন্নয়ন চায় তাদেরই ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।  ক্ষমতায় লুটেরার বদলে আর লুটেরা নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশপ্রেমিকদের দেখতে চায় জনগণ। সমাজবিপ্লবের চেতনায় গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের এখনই সময়।  
১৭.১০.২০২০
লেখকঃ  রাজনীতিবিদ কলাম লেখক।